‘এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আতিউর রহমান

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এর পঙক্তি ‘এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’ বিশ্লেষন করেছেন অর্থনীতিবিদ আতিউর রহমান

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ । রমনার রেসকোর্স ময়দানে সমবেত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দশ লক্ষাধিক মানুষ। তারা মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বুক বেঁধে দল-মত নির্বিশেষে সমবেত হয়েছেন তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনতে এ সমাবেশের মূল চেতনাই ছিল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ।’ বঙ্গবন্ধুও তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে ব্যক্ত করেছিলেন স্বাধীনতার অভিপ্রায় ।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

উনিশ মিনিটের এই ভাষণটিতে ঘনীভূত হয়ে আছে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার-বঞ্চিত বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের তীব্র আকাঙ্ক্ষার কথা। পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে ভাষণটি জনসাধারণ্যে শ্রুত হচ্ছে লক্ষ-কোটি বার। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে এই ভাষণ। বক্ষ্যমান নিবন্ধটি এই ঐতিহাসিক ভাষণের শিরোনামোক্ত বাক্যের পূর্বাপর বিশ্লেষণের একটি প্রয়াসমাত্র।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই অভিন্ন ও পরস্পর একাত্ম। যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন পথিকৃৎ। মৃত্যুকে তুচ্ছ ভেবে এগিয়ে গেছেন অবিচল চিত্তে। গণতান্ত্রিক মূল্যচেতনা, বৈষম্য-শোষণ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এই ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যই পরিস্ফুটিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে। এই মূলমন্ত্রকে তিনি সঞ্চারিত করেছিলে প্রত্যেক বাঙালির চেতনায়।

মুক্তির দিশারী বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন, একটি চেতনা । এই প্রবাদ পুরুষের রাজনৈতিক দর্শনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি আসে ।

জন্যই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, জাতির পিতা। সকল অর্থে ‘তিনিই বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন কাজ করে গেছেন বাঙালি জনগণের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য । স্বপ্ন দেখেছিলেন শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের। গড়তে চেয়েছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা, যা বাস্তবায়নে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতা তাঁর জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে গেছেন।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

সাতচল্লিশে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ তেইশ বছর শত শহিদের রক্তস্নাত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত রাজনৈতিক অধিকার অর্জন এবং সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামেই ছিল বঙ্গবন্ধুর দৃপ্ত পদচারণা। পাকিস্তান সৃষ্টির পরেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক আচরণ। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্রেই বাঙালিরা উপেক্ষিত হতে থাকে। দিনে দিনে রচিত হয় বৈষম্যের পাহাড় ।

জনসংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্ত্বেও সরকারি বাজেটের প্রায় পুরোটাই খরচ হতো পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য। এছাড়া বৈদেশিক সাহায্যের আশি ভাগই ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে । চাল, আটা ও তেলের দাম পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে ছিল দ্বিগুণ। কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক বিভাগের চাকরির প্রায় নব্বই শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের দখলে । প্রশাসনের শীর্ষে ছিলেন তারাই। এমনকি তারা নগ্ন আঘাত হানে বাঙালির মাতৃভাষা বাংলার ওপর।

এসব বৈষম্য ও পাকিস্তানিদের নানা অন্যায়-অত্যাচারকে উপজীব্য করে ছেষট্টিতে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিব ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। জনগণের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক কর্মসূচি মোকাবেলায় পাকিস্তানের সামরিক শাসক শেখ মুজিব ও তাঁর দলের ওপর অগণতান্ত্রিক ও ষাড়যন্ত্রিক আচরণ শুরু করে। ফলে তাঁর ওপর বার বার নেমে আসে দুঃসহ কারাজীবন। তবে তিনি ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। বরং তিনি বলেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

আর বাঙালি জনগণ পরিস্থিতির করুণার পাত্র না হয়ে থেকে পাকিস্তানি শাসকদের অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে আত্মদান করতেও পিছপা হয়নি। উনসত্তরে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম করেই শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করেন এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর আসে সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। এ নির্বাচনের ফলাফলে ঘটে বাঙালির শোষণ বৈষম্যের প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব করে ।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল, যে কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখা। এই ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু একাত্তরের মার্চের শুরুতেই পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিকামী মানুষ ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে । ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। সারা পূর্ব পাকিস্তান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করে বাঙালির প্রাণের এক নেতার রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া ।

অসহযোগ আন্দোলনের টানটান উত্তেজনায় যখন বাঙালি জনমানুষ আন্দোলিত, সেই পটভূমিতেই ৭ই মার্চ স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের সর্বব্যাপী গণজাগরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদান করেন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ । রেসকোর্সের পুরো ময়দান তখন পরিণত বিশাল জনসমুদ্রে । হাতে তাদের বাঁশের লাঠি আর কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি । লক্ষ্য তাদের অভিন্ন স্বাধিকার ও মুক্তি । চোখে তাদের মুক্তি-চেতনার আগুন । লড়াই করে অধিকার ছিনিয়ে আনার আগুন ।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

কী অসীম চাপ! একটি জাতির প্রত্যাশা। অদূরেই পাকিস্তানি সেনা। সামনে সাত কোটি বাঙালির রক্তমাখা চোখ । তারা চেয়ে আছে তাদের প্রাণের ও ভালোবাসার নেতার দিকে। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর কালো কোট পরনে নেতার চোখে সংগ্রাম। রক্তে উদ্বেলতা । মাথায় সাবধানতার অসীম ওজন। একটু এদিক-সেদিক হলেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনতে পারে হায়েনার দল তাই সাবধানে উচ্চারণ করতে হবে প্রতিটা শব্দ । অথচ কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি নেই নেই লিখিত কোনো স্ক্রিপ্ট । শুধু মাথায় আছে একটি মাত্র শব্দ ‘স্বাধীনতা’!

সাত কোটি মানুষের ভালোবাসায় আস্থা রেখে বাঙালি জাতির মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে শুরু করলেন সেই মহাকাব্যিক উচ্চারণ ভাষণের প্রথমে তিনি বাঙালি জাতির রাজনৈতিক অধিকার বারংবার ভূলুণ্ঠিত হওয়া আর চরম নিষ্ঠুরতায় তা দমিয়ে দেয়ার পুঞ্জিভূত মনোবেদনা তুলে ধরলেন। এরপর বাংলার মানুষ কার কাছ থেকে কী ধরনের মুক্তি ও অধিকার চায় সেগুলো তাঁর বক্তৃতায় ফুটে ওঠে সেদিন সবার চিন্তা-চেতনায় ছিল শত বছরের পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করবে। বঙ্গবন্ধুও তাঁর ভাষণে স্বাধীনতার অবয়ব আঁকেন এভাবে- “এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে ।’

বাঙালিরা কেমন করে অন্যায়-বঞ্চনাকে প্রতিহত, ন্যায়কে সমুন্নত, জাতিগত অসাম্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিল; জীবন দিয়ে চেষ্টা করেও সেগুলো একে একে ব্যর্থ হওয়ায় কেমন করে তাদের মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রাম মুখ্য হয়ে ওঠে তার ব্যাখ্যা দেন শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর পুরো দেশ বদলে যায় । যেন আগুনের তাপে ফুটন্ত পানির মতো টগবগ করতে থাকে সাত কোটি মানুষ জোরদার হয়ে ওঠে অসহযোগ আন্দোলন। শেখ মুজিবের নির্দেশই হয়ে ওঠে সরকারি নির্দেশ।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

মানুষও তা মানতে থাকে। এমনকি সরকারি প্রশাসনও বাংলার বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতি কর্তৃত্বমূলক এই নির্দেশাবলি প্রদানের অমিত তেজ, আস্থা আর প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন দীর্ঘ সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষায়। শুধু জনতার প্রতি নির্দেশই নয়, বরং পাকিস্তানি সেনাশাসকদের উদ্দেশ্যেও কয়েকটি শর্ত দিয়ে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের কথা উচ্চারণ করেন। সুচিন্তিতভাবেই তিনি ওই বক্তব্য দিয়েছিলেন। কেননা, স্বাধীনতা যতটা রাজনৈতিক-ভৌগোলিক, মুক্তি ততটাই অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক একটি জাতি স্বাধীন হলেই মুক্ত হয় না। বাঙালি স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও মুক্তি পায়নি। তারা পাকিস্তানের কাছে আত্মা বিক্রি করে দিয়েছিল ।

বঙ্গবন্ধু সেই মুক্তি চেয়েছিলেন, যা স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলে। এজন্যই তিনি প্রথমে মুক্তি ও পরে স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন মুক্তি মানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সকল ধরনের শোষণ-বৈষম্য থেকে মুক্তি । একটা স্বাধীন জাতিই কেবল পারে ওই ধরনের মুক্তির প্রত্যাশা করতে। তাই তাঁর এই ভাষণ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উন্মাতাল করে তোলে । সেই সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানিদের টনকও নড়িয়ে দেয় ।

মুক্তির দিশারী বঙ্গবন্ধুর জীবনটিই একটি দর্শন, একটি চেতনা। এই প্রবাদপুরুষের রাজনৈতিক দর্শনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি আসে।

[ ‘এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] ]

 

লেখক: আতিউর রহমান

অর্থনীতিবিদ, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

‘এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আতিউর রহমান
‘এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আতিউর রহমান

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিষয়ে আরও পড়তে পারেন :

Leave a Comment