‘শহীদের রক্তের উপর দিয়ে, পাড়া দিয়ে আর.টি.সি’তে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এর  পঙক্তি ‘শহীদের রক্তের উপর দিয়ে, পাড়া দিয়ে আর.টি.সি’তে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না’ নিয়ে লিখেছেন – সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

উদ্ধৃত বাক্যটি বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস-নির্দেশক ৭ই মার্চের ভাষণের অংশ । ভাষণটি সময়ানুগত্য ও বক্তব্য বিষয়ের নিহিতার্থের বিচারে বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে অনিবার্য এক বাঁক বদলের ইঙ্গিত। বাঙালি সেদিন যে নির্দেশনার জন্য উন্মুখ ছিল, তা তারা এই ভাষণের মাধ্যমে পেয়েছিল । আর এখানেই ভাষণটির ঐতিহাসিকতা ।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ – এটি ছিল বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ ও সংক্ষিপ্ততম ভাষণ । যেমন বলা যায়, বিন্দুতে সিন্ধুর গভীরতা। তবে সমগ্র ভাষণে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের যে স্বরূপটি উদ্ঘাটিত তা হলো জনতালগ্নতা। নেতৃত্ব মানেই আম-জনতার আকাঙ্ক্ষা অভীপ্সার প্রতিনিধিত্ব করা। নেতৃত্ব-বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক গ্যারি উইলস বলেছেন, ‘নেতৃত্বের কাজ হলো স্বপ্ন রচনা করা, আর জনগণকে এই স্বপ্নের সঙ্গী করে নেওয়া। উদ্দেশ্য হবে জনতার মিথস্ক্রিয়ায় স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ’। উল্লেখ্য, এ মন্তব্যেই নেতৃত্বের ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি নয়, বরং জনতালগ্ন (populist) হিসেবে নেতাকে উপস্থাপন করা হয়েছে।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

ব্যাপারটিও তাই। যে ব্যক্তি নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জনতাকে কৌশলে ব্যবহার করে তাকে নেতা বলা যায় না। ওইরূপ কৌশলে নিজের ইচ্ছাকে জনতার ইচ্ছা বলে চালিয়ে দিয়ে তাদের আবেগকে ব্যবহার করে ক্ষ কুক্ষিগত করা হয় । এমন নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত মুসোলিনি ও হিটলার। তাদের পরিণতি বা তাদের ক্ষমতাধীনে জনতার দুর্দশার কথাও জানা আছে। এদের নেতা (leader) না বলে বলা হয় ছদ্মনেতা (demagogue)। অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে এদের জনতালগ্ন বলেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু জনতালগ্নতার নিহিতার্থ বুঝতে হবে উপর্যুক্ত উদ্ধৃতির আলোকে নেতার জনতালগ্নতা মানে তাঁর মাধ্যমে নিজের ও জনতার স্বপ্ন একাকার হওয়া। এমন নেতার স্বপ্ন জনস্বার্থ-উৎসারিত । আর এ কারণে এমন নেতা কখনও জনস্বার্থবৈরী কোনো নীতি বা কর্মে ব্যাপৃত হন না।

ভাষণটি সময়ানুগত্য ও বক্তব্য বিষয়ের নিহিতার্থের বিচারে বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে অনিবার্য এক বাঁক বদলের ইঙ্গিত । বাঙালি সেদিন যে নির্দেশনার জন্য উন্মুখ ছিল তা তারা এই ভাষণের মাধ্যমে পেয়েছিল

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব বিশ্লেষণে এমন প্রাকথন যে লাগসই তা নিয়ে নির্দ্বিধ উপসংহার টানা যায় তিনি জনতার স্বপ্নকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন এবং তা রূপায়ণের জন্য প্রাণপাত করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ বাঙালির স্বপ্ন ছিল বলেই তা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন হয়েছিল, যা তিনি বাস্তবায়নের জন্য লাগসই কৌশলও নির্ধারণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-উৎসারিত কৌশল তাঁর সমকালে অনেকের কাছেই বোধগম্য ছিল না।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

যেমন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ (ন্যাপ) ছয় দফার নিহিতার্থ নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর উত্তর ছিল, ‘আরে বুঝলা না । দফা তো একটাই, একটু ঘুরাইয়া কইলাম ।’ একইভাবে ছাত্রলীগের তরুণ নেতা আবদুর রাজ্জাক অভিযোগ করেছিলেন, স্বাধীনতার কথা না বলে বঙ্গবন্ধু কেন বললেন। স্বায়ত্তশাসনের কথা উত্তরে বঙ্গবন্ধু সাংকেতিক ভাষায় বলেছিলেন, ‘তোমাদের ওপারে যাওয়ার সাঁকো তৈরি করে দিলাম। বলা বাহুল্য, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ বা আবদুর রাজ্জাক আর কথা বাড়াননি ।

‘শহীদের রক্তের উপর দিয়ে, পাড়া দিয়ে আর.টি.সি’তে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না’

জনতালগ্ন নন্দিত নেতা বঙ্গবন্ধু জনগণের স্বার্থকে বিকিয়ে দিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক অভিলাষ কখনই চরিতার্থ করেননি। এমন একজন নেতা হাজির আছেন বাক্যে । লক্ষণীয়, ইয়াহিয়ার সামরিক চক্রের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রেক্ষাপটে উত্তাল মার্চ অনিবার্য ছিল। আপসহীন নেতার বাঙালি তখন আন্দোলনরত ছিল। সংগ্রামী বাঙালি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্যাতন ও গুলির শিকার হয়েছিল । ঝরে গিয়েছিল বেশ কিছু প্রাণ। এমন এক পটভূমিতে ইয়াহিয়ার প্রস্তাব ছিল গোলটেবিল বৈঠকের, যেখানে সংকটাপন্ন রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল ।

আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক আদর্শে থিতু বঙ্গবন্ধু এমন এক প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারতেন। কিন্তু তা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ যে উদ্দেশ্যে শহিদের প্রাণ ঝরেছিল তা এই বৈঠকে যে অর্জিত হবে না সে বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহ ছিলেন। সে কারণে ভাষণের শুরুতেই তিনি মানুষ হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু জানতেন এমন দাবি পূরণ হবার নয়। সুতরাং তাঁর অনমনীয় অবস্থান । প্রস্তাবটি মেনে নিয়ে বৈঠকে অংশগ্রহণ করলে তা হতো শহিদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা। আর এ কাজ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ তিনি জনতালগ্ন নন্দিত নেতা। তাই তাঁর এমন দৃঢ় ও নির্দ্বিধ উচ্চারণ ।

লেখক : সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‘শহীদের রক্তের উপর দিয়ে, পাড়া দিয়ে আর.টি.সি’তে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
‘শহীদের রক্তের উপর দিয়ে, পাড়া দিয়ে আর.টি.সি’তে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিষয়ে আরও পড়তে পারেন :

Leave a Comment