‘রক্তের দাগ শুকায় নাই’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] হাসান আজিজুল হক

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এর পঙক্তি ‘ রক্তের দাগ শুকায় নাই ’ বিশ্লেষন করেছেন হাসান আজিজুল হক:

কোনো দিন শুকোবে না। বাইরের দাগ যদি কখনো মুছেও যায় বাঙালির হৃদয় থেকে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে তা শুকানোর তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং আজো ক্ষরণ চলছে। গোটা জাতির অবিরত এই রক্তক্ষরণের একমাত্র ন্যায্য প্রতিশোধ হচ্ছে অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামে বাঙালির উজ্জীবিত হওয়া

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

১৯৪৭ সালে, বিভ্রান্ত রাজনীতির আবর্তে আমরা যারা ভারত বিভাজন চেয়েছিলাম এবং বাংলাদেশকেও বিভক্ত করেছিলাম, সেই চরম ভুলের মাশুল আজো দিয়ে যাচ্ছি। এই জাতি ভোলে নাই সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পর থেকেই ওই পশ্চিম পাকিস্তানিদের আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষার ওপর খড়গহস্ত হওয়ার কথা। ওই সময় আমাদের বুঝতে বিলম্ব হয় নাই পশ্চিম পাকিস্তান বাংলাদেশকে নয়া উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। সেই আটচল্লিশ সালেই আমরা বুঝে ফেলেছিলাম ধর্মভিত্তিক দ্বি-জাতিতত্ত্ব ভ্রান্ত ছিল।

বাংলার হিন্দু-মুসলমান ভাই-ভাই সম্পর্ক চিরকালই রেখে এসেছিল। দুঃস্বপ্নের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে আমরা নিজেদের বুঝিয়েছিলাম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সেই ভ্রাতৃ সম্পর্কই থাকবে। কিন্তু আমাদের চরম ভুলের মাশুল সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই দিতে হয়েছে। এই মাশুলগুলোই শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দিয়েছে আমাদের বাঁধন কত আলগা ছিল।

উনসত্তরে গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন রক্তও ঝরছে, আগুনও ঝরছে। আগুন আর রক্ত একসঙ্গে। তবুও রক্তের দাগ শুকায়নি । ওই পটভূমিতেই দাঁড়িয়ে একাত্তর সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, ‘রক্তের দাগ শুকায় নাই ।’

পশ্চিম পাকিস্তানের বিরূপতায় আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ধ্বংসের দিকে পা বাড়িয়েছিল । কিন্তু আমরা, এই বাংলাদেশের মানুষরা, ভুল ধরতে কিছুমাত্র বিলম্ব করি নাই। ভাষার বিরুদ্ধে আক্রমণ আটচল্লিশ সালেই প্রতিহত করা হয়েছিল। তবে এর জন্য রক্ত ঝরেছিল। অন্যত্র নাচোল বিদ্রোহে আমাদেরই ভাই আদিবাসী সাঁওতালদের রক্তে বাংলাদেশের মাটি ভিজে গিয়েছিল। তারপর থেকেই রক্ত ঝরা আর কখনোই বন্ধ হয়নি। নাচোল বিদ্রোহের পর থেকেই আমাদের শুরু করতে হয়েছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

এই ভাষা আন্দোলনেও অনেক রক্তই দিতে হয় কিন্তু সেই রক্তের ওপরেই আমরা সৃষ্টি করেছিলাম বাঙালির সুউচ্চ বিজয়গাথা যে রক্ত ঝরেছিল বায়ান্ন সালে তা আমরা বৃথা যেতে দেইনি পাকিস্তানি শাসকদের শত ভ্রূকুটিতেও আমরা আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসিনি। ষাটের দশকের গোড়া থেকে ছাত্র আন্দোলন এবং উনসত্তরে বিশ্ব কাঁপানো গণঅভ্যুত্থানে কত যে রক্ত ঝরেছিল তার ইয়ত্তা নাই । তখনও আমরা রক্তের দাবি বৃথা যেতে দেইনি।

[ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে লিখেছেন – হাসান আজিজুল হক ]

আমাদের রক্তচ্ছটা নিয়ে শত শত ফোয়ারা সৃষ্টি হলো; উনসত্তরের গণআন্দোলনকে কিছুতেই স্তব্ধ করা গেল না। আমরা তখন যে মুক্তি চেয়েছিলাম তা পাকিস্তানি জঙ্গি শাসন থেকে মুক্তি নয় । আমরা সত্যিই তারপর স্বাধীন এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এত রক্তের দাম এককালে শোধ করতে চেয়েছি । করেছিও । সাতচল্লিশ সাল থেকেই যে নব্য ঔপনিবেশিক শাসন জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছিল তাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের রাজনীতির ক্রমাবর্তন ঘটে। বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটাকে তুলে দেওয়া হয়।

ওই সময় কিছু মতবিরোধ হলেও পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু একই সঙ্গে রাজনীতি করতেন। রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটিই কথা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাও। খুবই স্বাভাবিক যে, ওই পর্যায়ে সিসিড করার আন্দোলন বাস্তবসম্মত ছিল না। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি আমাদের সেই দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল। ভাসানী সেই সঙ্গে ইসলামি সমাজতন্ত্র যোগ করতে চেয়েছিলেন । সোহরাওয়ার্দী তাঁর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে রাজনীতিতে প্রায় নিরবলম্ব হয়ে উঠলেন। তাঁর মৃত্যুও হলো ‘৬২ সালে ।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

এই পরিস্থিতিতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে পূর্ণ স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে এগিয়ে নেন। বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী বঙ্গবন্ধু ‘৬৬ সালে যে ছয় দফা আন্দোলনের কর্মসূচি জাতির সামনে নিয়ে আসেন তার সারবস্তুই ছিল প্রায় পূর্ণ স্বাধীনতা। ওই সময়েই বাঙালির রক্ত ঝরেছে নানা উপলক্ষে, যা শুকানোরও কোনো ফাঁক ছিল না।

ছয় দফা সূত্রে আগরতলা মামলা শুরু হওয়ায় সাথে সাথে শুরু হয় গণআন্দোলন। উনসত্তরে গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন রক্তও ঝরছে, আগুনও ঝরছে। আগুন আর রক্ত একসঙ্গে। তবুও রক্তের দাগ শুকায়নি ওই পটভূমিতেই দাঁড়িয়ে একাত্তর সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘রক্তের দাগ শুকায় নাই ।’

লেখক : হাসান আজিজুল হক

কথাসাহিত্যিক ও অরসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

‘রক্তের দাগ শুকায় নাই’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] হাসান আজিজুল হক
‘রক্তের দাগ শুকায় নাই’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] হাসান আজিজুল হক

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আরও পড়তে পারেন :

Leave a Comment