‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আবদুল খালেক

‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ – বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এর এই অংশটি নিয়ে লিখেছেন আবদুল খালেক।

পৃথিবীতে যারা মহামানব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁরা নিজেদের প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার দ্বারা অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নানান তথ্য দিতে পারতেন । জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মহামানবসুলভ গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। দেশের রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভাষণটি ছিল পরাধীন বাঙালি জাতির জন্য দিক-নির্দেশনা ।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

এ ভাষণে জাতির অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের নানা বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি। ভাষণের শুরুতেই দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে পূর্ব বাংলার মানুষের অত্যাচার-নির্যাতন, শোষণ বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু। অল্প ক’টি বাক্যের মাধ্যমে তিনি অতীতের বিস্তৃত ইতিহাসের সত্য উপস্থাপন করেন।

পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের বঞ্চনার ইতিহাস মাত্র ক’টি বাক্য দ্বারা তিনি দেশবাসীকে অবহিত করেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের জনসভা। সবাই গভীর উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষমাণ; নেতার মুখ থেকে উচ্চারিত শব্দ এবং বাক্য শ্রোতাদের তখন মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেছে । তিনি অতীত থেকে বর্তমান অধ্যায়ে এসে দেশের মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরতে থাকেন ।

দেশের রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গ তাঁর কোনো কথা মেনে নিতে রাজি হয়নি । তিনি সামরিক শাসনের তীব্র সমালোচনা করেন। সামরিক শাসক আইয়ুবের শাসন, আগরতলা মামলা, মানুষের ওপর নির্যাতন এবং শেষ পর্যন্ত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুবের পতন। ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে। ইয়াহিয়া ক্ষমতা হাতে নিয়ে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে নানা রকম প্রতিকূলতার মধ্যেও শেখ মুজিব নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এ ব্যাপারে মওলানা ভাসানীর সাথে তাঁর মতপার্থক্য হয়।

শেখ মুজিবের অস্ত্র দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ । বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন । দেশের সকল মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করেন ।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

‘৭০-এর নির্বাচনে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। সমগ্র বিশ্ব বুঝতে পারে পাকিস্তানের জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিব ছাড়া অন্য কেউ নয়। নির্বাচনের ফলাফলে বিচলিত হয়ে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা। বিজয়ী আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে তাদের আপত্তি। শুরু হয় ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্রের নানা ডালপালা গজাতে থাকে। সামরিক ব্যক্তিদের সাথে যুক্ত হয় জুলফিকার আলী ভুট্টোর ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তারা আলোচনার টেবিল বেছে নেয়। আলোচনার টেবিলে শেখ মুজিবকে বসিয়ে সময় নষ্ট করতে থাকে । ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে হামলার প্রস্তুতি।

এদিকে শেখ মুজিবের অস্ত্র দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ । বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। দেশের সকল মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল স্বাধীনতার মন্ত্র মানুষকে জাগ্রত করবে; এবং এ বিশ্বাস শত ভাগ ঠিক ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তান সরকার পুনরায় তাকে কারাগারে নেবে অথবা হত্যা করবে । সুতরাং ৭ই মার্চের ভাষণে জাতিকে তিনি কিছু দিক-নির্দেশনা বা মেসেজ দিয়ে রাখেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি মেসেজ হলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর। হামলা হলে সবকিছু বন্ধ করে দিতে হবে ।

এই ভাষণে বঙ্গবন্ধুর শব্দ চয়ন লক্ষ করবার মতো। জনসভায় যে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি, তার অধিকাংশ ছিলেন গ্রাম বাংলার অশিক্ষিত বা নিরক্ষর জনগণ বঙ্গবন্ধু জানতেন, জনগণের মনের কথা বলতে গেলে তাদের মুখের ভাষায় বলতে হবে । তিনি তাই করেছেন। ‘আমি যদি হুকুম দেবার না পারি’ বাক্যটি যদি শুধু শহরের শিক্ষিত মানুষদের জন্য উচ্চারণ করতেন, তাহলে তিনি বলতেন— ‘আমি যদি হুকুম দিতে না পারি। কিন্তু বাক্যটিকে তিনি সেভাবে উচ্চারণ করেননি।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

বলতে গেলে ৭ই মার্চের সমগ্র ভাষণেই গ্রামের নিরক্ষর মানুষের মুখের ভাষার বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় । অনেক বাক্যে তিনি গ্রামের মানুষের মতো কখনও আপনি, কখনও তুমি শব্দ নিয়ে এসেছেন । এই ভাষণে বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ । এত তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ ইতিহাসে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালনের মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করেছে । এই ভাষণ মানুষের সামনে না থাকলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো কি না, ইতিহাস তা বিচার করবে । ভাষণে যখন তিনি বলেন – হুকুম দেওয়ার সুযোগ নাও ঘটতে পারে তখন বুঝতে হবে পাকিস্তানি শাসকবর্গ তাঁকে নিয়ে কী করবে, বঙ্গবন্ধুর তা অজানা ছিল না। তাঁর অবর্তমানে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ যাতে থেমে না যায় সে কথা বিবেচনায় রেখেই তিনি বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন।

এ থেকেই ধারণা করা যায়, কত বড়ো ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ও মহামানবোচিত গুণাবলির অধিকারী ছিলেন তিনি।

[ ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ]  ]

লেখক : অধ্যাপক আবদুল খালেক
উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল বিশ্ববিদ্যালয়,
সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ

‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আবদুল খালেক
‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আবদুল খালেক

আরও পড়তে পারেন :

Leave a Comment