‘আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আনিসুল হক

আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে’ – বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন এর এই অংশ বিশ্লেষন করেছেন আনিসুল হক।

শেখ মুজিবুর রহমান কখনও পূর্ব পাকিস্তান কথাটা মেনে নিতে পারেননি তিনি বলতেন, পূর্ব বাংলা, বাংলা, এবং শেষে তিনি ঘোষণাই দিয়ে দিলেন, ‘এই দেশের নাম হবে বাংলাদেশ।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

একাত্তরের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটা কেবল সুকৌশলী এবং সূক্ষ্মতর রাজনৈতিক নির্ভুলতার সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা ও গেরিলা যুদ্ধের ডাকই ছিল না, ছিল বাংলার ২৩ বছরের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত কিন্তু চমৎকার স্বচ্ছ একটা দর্পণ। যেন বিন্দুর মাঝে সিন্ধুদর্শন। কয়েকটা লাইনে গোটা ২৩ বছরের বঞ্চনা, শোষণ ও অপশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ সংগ্রাম আন্দোলনের ইতিহাস কী করে বলতে পারলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। তিনি ছিলেন অসাধারণ কথাকারও; অপরূপ বাগ্মী; তুলনারহিত দেশপ্রেমিক; যিনি দেশের মানুষের মুক্তির জন্য আত্মত্যাগে ও আত্মদানে সদাপ্রস্তুত। যার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলার মানুষের মুক্তি।

‘শেখ মুজিবুর রহমান, ১৯৪৭-এর মাঝামাঝি সময়ে, কলকাতায় সিরাজ উদ দৌলা হলে তাঁর বন্ধু সহকর্মীদের নিজের রুমে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান হতে যাচ্ছে, এই স্বাধীনতা সত্যিকারের স্বাধীনতা নয় । হয়তো বাংলার মাটিতে নতুন করে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে ।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭-এর মাঝামাঝি সময়ে কলকাতায় সিরাজ-উদ দৌলা হলে তাঁর বন্ধু সহকর্মীদের নিজের রুমে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান হতে যাচ্ছে, এই স্বাধীনতা সত্যিকারের স্বাধীনতা নয় হয়তো বাংলার মাটিতে নতুন করে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে।’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মযহারুল ইসলাম, আগামী প্রকাশনী, ২০০২, পৃষ্ঠা ৯৪)

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

‘বাংলাদেশের আইডিয়াটা প্রথম কবে আপনার মাথায় এলো?” অন্নদাশংকর রায়ের এমন প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সেই ১৯৪৭ সালে । তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।’ (ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু, সম্পাদনা: নূহ-উল-আলম লেনিন, প্রকাশক: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ)। শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা থেকে ঢাকায় এলেন ১৯৪৭ সালে । ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’- এই দাবিতে ১৯৪৮ সাল থেকেই শুরু করলেন আন্দোলন । গেলেন মিছিলে । গ্রেপ্তার বরণ করলেন ।

শেখ মুজিবুর রহমান কখনও পূর্ব পাকিস্তান কথাটা মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলতেন, পূর্ব বাংলা, বাংলা, এবং শেষে তিনি ঘোষণাই দিয়ে দিলেন, ‘এই দেশের নাম হবে বাংলাদেশ। পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি দেখবেন, ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে আপনারা এটাকে বাংলা বলে ডাকেন । বাংলা শব্দটার একটা ইতিহাস আছে, আছে ঐতিহ্য।’

পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে বঙ্গবন্ধু একদিনের জন্যও মেনে নেননি । যদিও পাকিস্তান আন্দোলনে অংশও নিয়েছিলেন। ১৯৭০-এ ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেট কর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলা মধ্যপ্রাচ্যের অংশ নয়, এটা দক্ষিণ এশিয়ার অংশ।’ (দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ, আর্চার কে ব্লাড, ইউপিএল)।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

অন্যদিকে পাঞ্জাবিরা পূর্ব বাংলাকে তাদের একটা কলোনি বা উপনিবেশ হিসাবে জ্ঞান করতে লাগল। যাই হোক না পাঞ্জাবিরাই কেবল পাকিস্তান শাসন করবার উপযুক্ত এই ছিল তাদের বিশ্বাস। তারা মনে করত, বাঙালিরা কালো, ছোটখাট, ভীরু । ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের ডাকতেন ‘মাচ্ছার’ বা ‘মশা’ বলে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে, এটা তারা দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। শেখ মুজিব জানতেন যে তাই হতে যাচ্ছে।

নির্বাচন হয়ে গেলেই তিনি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন। তা যখন হয়েই গেল, তখন পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি আওয়ামী লীগের অর্ধেকের মতো আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন, একদিন প্রকাশ্যে বলেই ফেললেন, ‘পাকিস্তান শাসন করেছে পাঞ্জাবিরা, এবারও পাঞ্জাবিদের ভাগ দিতে হবে।” নিজে পাঞ্জাবি ছিলেন না, কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের মনের কথা, আচরিত প্রথা তিনি প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। এটা প্রকাশিত ১৯৭০ সালে, তখনকার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কথাতেও।

[ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ গেরিলা যুদ্ধের ডাকই ছিল না, ছিল বিন্দুর মাঝে সিন্ধুদর্শন ]

আগে তিনি একটা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) তাতে বলা হয়েছিল, ‘ভোটের পরে সংবিধানের ভিত্তি হবে ঐক্য আর ইসলামি চেতনা নির্বাচনের প্রচারাভিযানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানি এক সাংবাদিককে ‘আমার লক্ষ্য বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী তিনি বলেন, ‘একবার নির্বাচন হয়ে গেলে এলএফও আমি ছিঁড়ে দেব।’ সেইসব কথা রেকর্ড প্লেয়ারে রেকর্ড করা হয় এবং ইয়াহিয়া শোনানো হয়। ইয়াহিয়া খানও বলেন, ‘আমি ওকে শায়েস্তা করব।’

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

বাঙালিরা পাকিস্তানের নেবে, ঢাকা হবে রাজধানী, থেকে বা বরাদ্দ যাবে পশ্চিম পাকিস্তানে, পাকিস্তানিরা দুঃস্বপ্নেও আর পাকিস্তানি জেনারেলরাও ভাবেননি, রাজনীতিকেরা শাসক হতে পারে একে তো সিভিলিয়ান, ওপর বাঙালি, দেশের ক্ষমতা নেবে, এটা ছিল তাদের চিন্তারও অতীত।

চিন্তায়, চেতনায়, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সংস্কৃতিতে পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিজেদের ঊর্ধ্বতন, বাঙালিদের মানুষ হিসাবেই করত না, মুসলমানও তারা ভেবেছিল, চিরটাকাল তারা করবে, করবে, চাকর-বাকর বানিয়ে রাখবে।

মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালে লাহোরের টেবিল বৈঠকে পূর্ব পশ্চিম বৈষম্যের যে ছবি তুলে ধরেন নিম্নরূপ: তার চুম্বক অংশ :

১) পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ৫৬ গুণ বেশি।

২) পূর্ব পাকিস্তানে হাসপাতালে বেড সংখ্যা ৬৯০টি, পশ্চিম পাকিস্তানে ২৬২০০টি।

৩) পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬১-৬৬ সালে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮টি, পশ্চিম পাকিস্তানে ৪৮টি।

৪) বৈদেশিক ঋণের শতকরা ৮০ ভাগ ব্যয় করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে ।

অথচ পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় ঢের বেশি।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

কিন্তু বাঙালিদের সম্পর্কে বিরূপতার কারণে তাদের মনোভাব ছিল এরকম: বাঙালিরা ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করবে? তাতো হতেই পারে না। এজন্য যখনই নির্বাচনের প্রশ্ন এসেছে, তখনই পশ্চিমা কায়েমি শাসকচক্র তা প্রতিহত করেছে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনেই পশ্চিমা স্বার্থের পাহারাদার মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে । যুক্তফ্রন্ট নির্বাচিত হয়েছে । কিন্তু তাদের বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হয়নি। ববঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে সে-কথা বলেছেন – ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। এরপর তো আইয়ুব খান সামরিক শাসন দিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষায় জাতিকে ‘গোলাম’ করে রাখা হলো ।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুরো পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল। এবার কি আওয়ামী লীগ তথা বাঙালিদের পাকিস্তানি শাসকেরা ক্ষমতা দেবে? ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই সামরিক জান্তা ও তাদের নীতিনির্ধারকেরা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন, তারা বাঙালিদের ক্ষমতা দেবেন না। তারা কঠোরভাবে সামরিক শাসন পরিচালিত করবেন। অপারেশন ব্রিজ পরিচালনা করা হবে।

ইয়াহিয়া খান বললেন, দরকার হলে ত্রিশ লাখ বাঙালিকে হত্যা করা হবে। ভুট্টোও ইয়াহিয়াকে বলেছেন, ‘আপনি অ্যাসেম্বলির অধিবেশন পিছিয়ে দিন, তাহলেই দেখবেন শেখ মুজিব বিদ্রোহ করবে। তখন আপনি আবার মার্শাল ল জারি করে দিতে পারবেন। তিনি বলেছিলেন, কুড়ি হাজার বাঙালিকে মেরে ফেললেই সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। শেখ মুজিব মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া নেতা, আওয়ামী লীগ বুর্জোয়াদের দল, তারা গেরিলা যুদ্ধ করতে পারবে না।’

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

১৯৭০ সালের ৯ এপ্রিল খুলনার বাগেরহাটের জনসভাতেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়। শোষণের ও অবিচারের শৃঙ্খল হইতে দেশের মানুষকে বিশেষ করিয়া বাংলার মানুষকে মুক্ত করার জন্যই আমার সংগ্রাম শুধু প্রধানমন্ত্রিত্ব কেন, সারা দুনিয়ার ঐশ্বর্য আর ক্ষমতা আমার পায়ের কাছে ঢালিয়া দিলেও আমি দেশের বিশেষ করিয়া বাংলার বঞ্চিত মানুষের সঙ্গে বেঈমানী করিতে পারিব না।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১০ এপ্রিল, ১৯৭০)

বঙ্গবন্ধু জানতেন, তিনি কী করতে যাচ্ছেন । পাকিস্তানিরাও ত, তারা কী করতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু জানতেন, পাকিস্তানিরা ক্ষমতা দেবে না, তিনিও নেবেন না। তিনি বাংলার মানুষের মুক্তি চান, চান বাংলার স্বাধীনতা পাকিস্তানিরাও জানে, বাঙালিকে আমরা ক্ষমতা দেব না, ওরা যখনই ক্ষমতা নেবার চেষ্টা করবে, তখনই তাদের ওপর হামলা করতে হবে। অতীতেও তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া হয়েছে, এবারও হচ্ছে,

এরই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু তাঁর কৌশল জানিয়ে দিলেন- ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ তারপরেই সেই ঐতিহাসিক মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের আহ্বান।

[ ‘আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] ] 

লেখক : আনিসুল হক
কথাসাহিত্যিক ও সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক প্রথম আলো

 [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] ‘আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে’- আনিসুল হক
‘আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আনিসুল হক

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিষয়ে আরও পড়তে পারেন :

Leave a Comment