‘দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আবু সাঈদ খান

দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে – বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে বলেন। 

বাংলার জনগণ এবং জনগণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অপরাধ একটাই- তারা আত্মমর্যাদা ও অধিকারের দাবি তুলেছিলেন, দুই অংশের মধ্যে বৈষম্যের অবসান চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক শাসন।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

শিরোনামের বক্তব্য-অংশ স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে গৃহীত । মুক্তিযুদ্ধ সূচনার ১৮দিন আগে দেওয়া ভাষণে তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার উদ্দেশ্যে চরম হুঁশিয়ারি এবং একই সঙ্গে বাংলার জনগণকে চূড়ান্ত মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ ভাষণে আরও ছিল সামগ্রিক পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এবং বাংলার মানুষের মর্মবেদনার কথা । উদ্ধৃত অংশে সেই পুঞ্জিভূত মর্মবেদনাই প্রকাশিত

৩ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা কিন্তু হঠাৎ করেই ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বললেন:

‘ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসেবে অ্যাসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাব। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। পঁয়ত্রিশ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসেন। তারপরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো। দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। অথচ সবারই জানা কথা, জুলফিকার আলী ভুট্টো দূরভিসন্ধিমূলক উক্তি করেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে অ্যাসেম্বলি ।’

তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যদের সংসদে যোগ না দেওয়ার আহবান জানান। পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত অচল করে দেওয়ার হুমকিও দেন । সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে তার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই:

‘আমি বললাম, অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব। এমনকি আমি এও পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজন যদিও হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব। জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে, আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরও আলোচনা হবে। তারপরে অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, ওদের সঙ্গে আলাপ করলাম – আপনারা আসুন, বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি।’

তা সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে দায়ী করতে কুণ্ঠিত হন না সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান । এভাবেই নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে বাংলার জনগণের ওপর দোষ চাপান। তবে এমন মিথ্যাচার এই প্রথম নয়, শেষও নয়। বাংলার মানুষের ওপর দোষ চাপানো ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একটি অপকৌশল । যার প্রয়োগ দেখা যায় পাকিস্তানের শুরু থেকেই ।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলার জনগণ সংগতভাবে প্রত্যাশা করেছিল, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাবে । কিন্তু ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে বলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তখন থেকেই উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলাজুড়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ন্যায়সংগত এই দাবির প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা দেখায় না। উপরন্তু, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর সংখ্যালঘিষ্ঠের ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

৫২ সালে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে অনুষ্ঠিত ছাত্রজনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি করা হয় । এতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরো কয়েকজন শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ । তখনও দোষ দেওয়া হয়েছিল আন্দোলনকারীদের, বাংলার জনগণকে ।

‘দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে’ –  বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ

১৯৫৪ সালে ৯২-এর ‘ক’ ধারা জারি করে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়।

‘৫৮ সালে সামরিক আইন জারি করে প্রতিবাদী নেতাকর্মীদের দমন পীড়ন ও কারা নির্যাতন করা হয় ।

‘৬২-তে শিক্ষার অধিকারকামী ছাত্রদের ওপর গুলি করা হয়, ‘

৫৮ সালে সামরিক শাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়,

‘৬৬ সালে স্বাধিকার আন্দোলনের মিছিলে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ চলে,

‘৬৮ সালে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান জননেতা শেখ মুজিবসহ বাংলার এক ঝাঁক দেশপ্রেমিক সন্তানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করে।

এরপর ‘৬৯ সালের গণআন্দোলনে হত্যা করা হয় আসাদ, মতিউর, জোহা, সার্জেন্ট জহুরুল হকসহ অনেককে।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

এসব ঘটনায় পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক শাসকচক্র কখনো অনুশোচনা করেনি। বরং দোষ দেওয়া হয় বাংলার মানুষকে। নানা সময়ে দোষ দেওয়া হয়েছে বাংলার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেও। তাঁদের হতে হয়েছে নানা নির্যাতনের শিকার । আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তানি শাসককুলের চক্ষুশূল। পাকিস্তানের ২৩ বছরই জেল-জুলুম নির্যাতন ছিল তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী ।

বাংলার জনগণ এবং জনগণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অপরাধ একটাই— তারা আত্মমর্যাদা ও অধিকারের দাবি তুলেছিলেন, দুই অংশের মধ্যে বৈষম্যের অবসান চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক শাসন ।

পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বাংলার জনগণের অবদান ছিল অধিক । বাংলার পাট, চা, চামড়া ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আসত । কিন্তু এর সিংহভাগই তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় হতো । রাষ্ট্রীয় ব্যয়-বরাদ্দ, চাকরি-বাকরি সব ক্ষেত্রেই বাংলা ছিল উপেক্ষিত, অধিকার বঞ্চিত ।

১৯৭০ সালে সোনার বাংলা শশ্মান কেন’ শিরোনামে প্রচারিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পোস্টারে বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয় । ওই চিত্রটি নিম্নরূপ :

বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজস্ব ব্যয় যথাক্রমে ১৫০০ কোটি ও ৫০০০ কোটি, উন্নয়ন ব্যয় যথাক্রমে ৩০০০ কোটি ও ৬০০০ কোটি, বৈদেশিক ব্যয় যথাক্রমে শতকরা ২০ ভাগ ও ৮০ ভাগ, বৈদেশিক দ্রব্য আমদানি যথাক্রমে শতকরা ২৫ ভাগ ও ৭৫ ভাগ, কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি যথাক্রমে শতকরা ১৫ ভাগ ও ৮৫ ভাগ, সামরিক বিভাগে চাকরি যথাক্রমে শতকরা ১০ ভাগ ও ৯০ ভাগ, চালের দাম মণপ্রতি যথাক্রমে ৫০ টাকা ও ২৫ টাকা, আটা যথাক্রমে মণপ্রতি ৩০ টাকা ও ১৫ টাকা এবং স্বর্ণের ভরি যথাক্রমে ১৭০ টাকা ও ১৩৫ টাকা। এমন বৈষম্য অবসানের জন্য ১৯৫৪ সালে উত্থাপিত হয় যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা এবং ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ৬ দফা।

Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ
Bangabandhu 7th March Speech, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

সবশেষে ১৯৬৯ সালে শিক্ষা, গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ধারণ করেই সংগঠিত হয়েছে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার আন্দোলন।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ পরিসংখ্যান অস্বীকার করতে পারেনি। কিন্তু ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতিও তারা সম্মান দেখায়নি। ক্ষমতার জোরে তা অগ্রাহ্য করেছে। যখনই বাংলা থেকে বৈষম্য অবসানের দাবি উঠেছে, তখনই বলা হয়েছে— গেল গেল পাকিস্তান গেল, গেল গেল ইসলাম গেল; বাঙালিরা পাকিস্তানের শত্রু, ইসলামের শত্রু।

এ জন্যই পশ্চিমা গোষ্ঠী গণরায় অগ্রাহ্য করে একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান ও ইসলামের নামে বাংলার নিরীহ জনগণের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে। বাংলার জনগণ এর জবাব দিয়েছে নয় মাসের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের মাধ্যমে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে । ৩০ লাখ জীবন আর দুই লাখ নারীর সর্বস্বত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলার স্বাধীনতা ।

[ ‘দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ]]

লেখক : আবু সাঈদ খান
সম্পাদক : দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ

‘দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আবু সাঈদ খান
‘দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে’ [ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ] আবু সাঈদ খান

আরও পড়তে পারেন :

Leave a Comment